বৃহস্পতিবার, আগস্ট ১৮, ২০২২

অবহেলিত লাকসামের দুই বীরাঙ্গনা ৭ বছরেও মিলেনি জেলা প্রশাসকের দেয়া জমি

Must Read


কুমিল্লা জেলা প্রশাসক কর্তৃক বীরাঙ্গনাদের যে খাস জমি দেওয়া হয়েছিল ২০১৫সালে গত সাত বছরেও কুমিল্লার লাকসামের দুই বীরাঙ্গনা তা বুঝে পায়নি বলে জানিয়েছেন। গতকাল ৭ মার্চ সোমবার দুপুরে লাকসামের দুই বীরাঙ্গনা ফাতেমা বেগম ও মোসা: নূর বানুকে ফোন করলে পূর্ব পরিচিত এই প্রতিবেদকের সাথে প্রায় অভিন্ন সুরে বিক্ষুদ্ধ হয়ে উঠলেন তারা। খাস জমি লিখে দিয়ে তা বুঝে না দেওয়ার কথা জানালেন তাদের সন্তানেরাও। সাবেক জেলা প্রশাসক হাসানুজ্জামান কল্লোল থাকলে এত দিনে জমি বুঝে ােতেন এ কথা জানাতেও ভুলেননি তারা।








কান্না জড়িত কন্ঠে কুমিল্লার লাকসামের পাইকপাড়া এলাকার মৃত আরব আলীর স্ত্রী বীরাঙ্গনা ফাতেমা বেগম বললেন, বাজান, কুমিল্লার ডিসি সাব কেন আমার সাথে তামাশা করল। গন্ডগোলের বছর পাকিস্তানিরা নির্যাতন করেছে। মনে করছি আর মনে হয় বাঁচবো না। কিন্তু এখনো আল্লাহ আমাকে বাঁচিয়ে রাখছেন। আপনি আমাদের জন্য বই লেখার পর মানুষ আমাকে সম্মান করে এখন। কিন্তু কুমিল্লার ডিসি সাব যে জায়গা আমাদের দিয়েছে এটা নাকি অন্য মানুষের জায়গায়। এ ব্যাপারে আমার মেয়ে ও মেয়ের জামাই ইউএনও’র কাছে গিয়েছে কিন্তু কোন লাভ হয়নি। পারলে ডিসি সাবকে বলবেন, গরীব বীরাঙ্গনার সাথে এমন করা ঠিক হয়নি।








বীরাঙ্গনা ফাতেমা বেগমের বড় মেয়ে খুরশিদা বেগম বলেন, স্যার, আমার কোন ভাই নেই, বাবাও বেঁচে নেই। আমরা তিন বোন। আমার স্বামী রিক্সা চালায়। মা খুব অসুস্থ থাকে প্রায়। অনেক ঔষুধ কিনতে হয়। রিক্সা চালিয়ে সংসারে খরচ করে আমার গরিব স্বামী ভালো করে মার খেদমত করতে পারে না। সারা দিন শুনি সরকার মুক্তিযোদ্ধা , বীরাঙ্গনাদের জন্য এই করে সেই করে। কিন্তু আমার মা তো তিন বেলা খাইতেও পারে না। ডিসি কল্লোল স্যার থাকতে আমাদের খাস জমি দিয়েছিল।আমাদের বাড়ি থেকে অনেক দূরে। আমরা দখল করতে গেলে অন্য মানুষ বাঁধা দেয়। বলে এই জমি না কি তাদের। কয়েকবার এই বিষয়ে ইউএনও অফিসে গিয়েছিলাম। ইউএনও স্যার আজ যাইব কাল যাইব করে। আর যায় না। ভাবলাম,এটা বড়লোক অফিসারদের গরিবের সাথে তামাশা। এরপর আর যাই না।








একই উপজেলার নশরতপুর এলাকার মৃত বেলায়েত হোসেনের স্ত্রী বীরাঙ্গনা মোসা.নুর বানুও ফাতেমা বেগমের মত প্রায় একই কথা বলেন। তিনি জানান, কুমিল্লার ডিসি আমাদের যে জমি দিয়েছে সেই জমিতে এখনো পানি। এটি একটি ডোবা। স্যারেরা বলছিল, মাটির ভরাট করে ঘর তুলে দিবে। কিন্তু সাত বছরেও কোন খবর নেই। এখন আমার পোলা আর সেই ডোবার কাছে যায় না।

বীরাঙ্গনা নুর বানুর ছেলে মো. কামাল হোসেন দু:খ করে বলেন, স্যার , কইতে পারেন, বড় বড় সাবরা গরীবের সাথে ভালো মানুষের অভিনয় করে কেন। আমার মা তো কুমিল্লার ডিসির কাছে জমি চায়নি। তিনি মুক্তিযুদ্ধে মায়ের অবদান ও আমরা গরিব বলে খাস জমি দিল। কিন্তু এমন এক জায়গায় দিল যেখানে সারা বছর পানি থাকে। তাহলে আমাদের কি লাভ হলো। আমরা দুই বছর আগেও ইউএনও অফিসে যোগাযোগ করছিলাম। কইছিল মাটি ভরাট করে ঘর করে দিবে। আর দেয়নি। দু:খ করে এখন আর যাই না। আমি একজন ছোট ড্রাইভার। কষ্ট করে চলি । আজ পর্যন্ত কেউ আমার মাকে কোন সাহায্য করেনি।

উভয় বীরাঙ্গনাই তাদের বীর নারী মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছেন।

কুমিল্লা প্রেস ক্লাব ও কুমিল্লা জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক এড.সৈয়দ নুরুর রহমান বলেছেন, মুক্তিযোদ্ধা আর বীরাঙ্গনারা আমাদের দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান। বর্তমান সরকার বীরাঙ্গনাদের বীর নারী মুক্তিযোদ্ধার সম্মান দিয়েছে। কুমিল্লায় আপনি ( প্রতিবেদক) বীরাঙ্গনাদের নিয়ে ধারাবাহিক কাজ করে বই প্রকাশ করে জাতির সামনে তাদের তুলে ধরেছেন। যার কারণে কুমিল্লার বেশ কয়েকজন বীরাঙ্গনা আজ বীর নারী মুক্তিযোদ্ধার সম্মান পেয়েছে। আশা করি বাকিজনেরাও পাবেন।

হাসানুজ্জামান কল্লোল সাহেব যখন ডিসি ছিলেন তখন তাদের প্রথম শহরে এনে সংবর্ধনা দিয়ে নিজ নিজ উপজেলায় খাস জমি দিয়ে তাদের সম্মানিত করেছিলেন। কিন্তু সাত বছর পর এসে জানলাম এখনো লাকসামের দুই বীরাঙ্গনা জমি বুঝে পায়নি। যা বীরাঙ্গণাদের নামের প্রতি চরম অবমাননা বলে আমি মনে করি।

কুমিল্লা জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা সফিউল আহমেদ বাবুল বলেন, এটি অত্যান্ত দু:খজনক ঘটনা। অনেকের সমস্যা হয়েছিল আমি ডিসি সাহেবদের সাথে কথা বলে সমাধান করে দিয়েছি। এরা তো আমার কাছে কখনো আসেনি। এখন যেহেতু আপনি বলেছেন তাহলে খবর নিয়ে যাতে তারা দ্রুত পায় সেই ব্যবস্থা গ্রহণ করব ইনশাআল্লাহ্ ।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কুমিল্লা জেলা প্রশাসক মো. কামরুল হাসান বলেন, বিষয়টি আমি জানি না। এই মাত্র শুনলাম। জেনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ও কুমিল্লার সাবেক ডিসি কবি হাসানুজ্জামান কল্লোল বলেন, আমি যখন কুমিল্লার ডিসি ছিলাম তখন আমি , আপনিসহ আমরা বীরাঙ্গনাদের নিয়ে কাজ করেছি। তাদের খাস জমি দেওয়ার ব্যবস্থা করেছি তাদের মাথা গোজার ঠাঁই করে দেওয়ার জন্য।

এরপরতো আমি চলে আসলাম। এখন যেহেতু আপনার কাছ থেকে শুনলাম তাদের মধ্যে কেউ কেউ পায়নি বিষয়টি সত্যিই দু:খজনক। আপনিতো এদের নিয়ে কাজ করছেনই। প্রয়োজনে আমি ডিসি সাহেবকেও ফোন করব যাতে তারা তাদের জমি গুলো দ্রুত বুঝে পায়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Latest News

Click to see the journey of Grameenphone creating impact in the society

video type: youtubeyoutube video id: bm_CVcTUt6YAllowed Page: Social ImpactVideo Thumbnail: 

More Articles Like This